দুর্গাপুরে পাবলিক গ্রন্থাগার ও পরিত্যক্ত ইউপি ভবন দেখিয়ে সার ডিলারের আবেদন

দুর্গাপুরে পাবলিক গ্রন্থাগার ও পরিত্যক্ত ইউপি ভবন দেখিয়ে সার ডিলারের আবেদন
ছবিঃ মোঃ রাজিব খাঁন

দৈনিক বিজয় নিউজ বিশেষ প্রতিনিধিঃ

রাজশাহীর দুর্গাপুরে সার ডিলার নিয়োগের আবেদন ঘিরে গুদাম দেখানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, জয়নগর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ বাজারে একসময় পাবলিক গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত একটি ভবনকে সার সংরক্ষণের গুদাম হিসেবে দেখিয়ে আবেদন করেছেন মেসার্স তারেক ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. সাইদুর রহমান। অন্যদিকে দেলুয়াবাড়ী ইউনিয়নে আব্দুস সামাদ ইউনিয়ন পরিষদের পরিত্যক্ত তিনটি ঘরকে গুদাম হিসেবে দেখিয়ে আবেদন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে গিয়ে কালীগঞ্জ বাজারে ‘মেসার্স তারেক ট্রেডার্স’ নামে একটি সাইনবোর্ড দেখা যায়। সাইনবোর্ডে প্রতিষ্ঠানটির নিচে বড় করে লেখা রয়েছে—‘সার বিক্রয় কেন্দ্র’। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভবনটি দীর্ঘদিন আগে পাবলিক গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সেখানে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের নিয়মিত যাতায়াত ছিল এবং বই-পত্রিকা পড়ার সুযোগও ছিল। কয়েক বছর ধরে গ্রন্থাগারটি বন্ধ রয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী জানান, স্কুলজীবনে তারা ওই গ্রন্থাগারে গিয়ে নিয়মিত বই পড়তেন। তবে বর্তমানে এটি বন্ধ থাকায় সেখানে আর পাঠকদের আনাগোনা নেই। স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকার কাছে গ্রন্থাগারটি কেন বন্ধ রয়েছে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান। তবে বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষক বলেন, গ্রন্থাগারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে বেতন দেওয়ার মতো অর্থ না থাকায় প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে ওই স্থাপনাকে সার গুদাম হিসেবে দেখিয়ে ডিলার নিয়োগের আবেদন করায় স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন উঠেছে—সার সংরক্ষণের জন্য গুদামের উপযোগিতা, ধারণক্ষমতা ও অন্যান্য শর্ত যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না।

‘আগে লাইব্রেরি ছিল’—স্বীকার আবেদনকারীর এ বিষয়ে মেসার্স তারেক ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. সাইদুর রহমানের সঙ্গে কথা হলে তিনি ভবনটি একসময় পাবলিক গ্রন্থাগার ছিল বলে স্বীকার করেন। তবে তার দাবি, জায়গাটি ব্যক্তি মালিকানাধীন। সাইদুর রহমানের ভাষ্য, মামুন নামের এক ব্যক্তির জায়গা আওয়ামী লীগের সাবেক চেয়ারম্যান মজিদ দখল করার উদ্দেশ্যে সেখানে লাইব্রেরি করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি মারা যাওয়ার পর সেখানে আর কেউ আসতেন না। কয়েক বছর ধরে ঘরটি পান বিক্রেতারা ব্যবহার করতেন। বর্তমানে তিনি সেটি ভাড়া নিয়েছেন। তিনি নিজে কোনো ব্যবসা করেন কি না জানতে চাইলে সাইদুর রহমান বলেন, তিনি ব্যবসা করেন না। তবে তার কোল্ডস্টোরে আলু রয়েছে এবং মাঝে মধ্যে আলুর ব্যবসা করেন।

যাচাই-বাছাই নিয়ে কর্মকর্তার বক্তব্য জয়নগর ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন বলেন, সার ডিলার নিয়োগের জন্য উপজেলা পর্যায়ে একটি যাচাই-বাছাই কমিটি রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওই কমিটির সভাপতি। জয়নগর ইউনিয়নে সরেজমিনে বিষয়গুলো দেখার দায়িত্ব উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তা মেহেদী হাসানকে দেওয়া হয়েছে। সাইদুর রহমানের দেখানো গুদাম সম্পর্কে জানতে চাইলে মোতালেব হোসেন বলেন, জায়গাটিতে আগে গ্রন্থাগার ছিল—এটি সত্য। বর্তমানে সেখানে গ্রন্থাগার নেই। ঘরটির মালিকানা রয়েছে এবং সাইদুর রহমান সেটি ভাড়া নিয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি একটি এগ্রিমেন্টের কপিও জমা দিয়েছেন বলে জানান।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, আগে পাবলিক গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত একটি ঘর বর্তমানে ভাড়া নেওয়া হয়েছে—শুধু এ তথ্যই কি সার সংরক্ষণের গুদাম হিসেবে যোগ্যতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট? নাকি গুদামের ব্যবহারযোগ্যতা, ধারণক্ষমতা, নিরাপত্তা ও সার সংরক্ষণের উপযোগিতা সরেজমিনে যাচাই করা প্রয়োজন—এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা চলছে। পরিত্যক্ত ইউপি ভবন নিয়েও প্রশ্ন অন্যদিকে দুর্গাপুরের দেলুয়াবাড়ী ইউনিয়নে আব্দুস সামাদকে ঘিরে আরও একটি অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি সার ডিলারের আবেদনে ইউনিয়ন পরিষদের পরিত্যক্ত তিনটি ঘরকে গুদাম হিসেবে দেখিয়েছেন।

দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোতালেব হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ওই পরিত্যক্ত ইউনিয়ন পরিষদের ঘর দেখেছেন বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে আব্দুস সামাদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। ‘জেলা পর্যায়ে আরও যাচাই হবে’ দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে হাবিবা ফারজানার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তিনি নিজে প্রতিটি আবেদন তদন্ত করেননি। প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য কৃষি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তাদের দেওয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সুপারিশ করে জেলা প্রশাসকের কাছে তালিকা পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করা হবে। প্রতিবেদকের কাছে উত্থাপিত অভিযোগগুলো তার জানা নেই বলেও জানান তিনি। উপজেলা থেকে কতজনের নাম সুপারিশ করা হয়েছে, তা ওই মুহূর্তে তার জানা নেই জানিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।

‘নিয়ম অনুযায়ী সবকিছু করা হয়েছে’ দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাহানা পারভীন লাবনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী সবকিছু করা হয়েছে। কালীগঞ্জ বাজারের স্থাপনাটিকে পাবলিক গ্রন্থাগার বলা ঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার দাবি, ওই ঘরের মালিক রয়েছেন এবং সাইদুর রহমানের সঙ্গে এ বিষয়ে একটি এগ্রিমেন্ট হয়েছে। সেই ভিত্তিতেই আবেদনটি তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবে আব্দুস সামাদ ইউনিয়ন পরিষদের পরিত্যক্ত ঘর দেখিয়ে আবেদন করেছেন—এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি কর্মকর্তা এড়িয়ে যান। পরে তিনি বলেন, সার ডিলারের তালিকা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। জেলা প্রশাসক পর্যায়ে আরও যাচাই-বাছাই হবে।

চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে সরেজমিন যাচাইয়ের দাবি এদিকে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রকাশিত আবেদনকারীদের তালিকায় দুর্গাপুরের দেলুয়াবাড়ী ও জয়নগর ইউনিয়নের একাধিক আবেদনকারীর নাম রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সার ডিলার নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় শুধু কাগজপত্রের ওপর নির্ভর না করে আবেদনকারীর দেখানো গুদামের প্রকৃত অস্তিত্ব, মালিকানা বা ভাড়ার বৈধতা, ধারণক্ষমতা, নিরাপত্তা, ব্যবহারযোগ্যতা এবং সার সংরক্ষণের উপযোগিতা সরেজমিনে যাচাই করা প্রয়োজন।

দৈনিক বিজয় নিউজ / মোঃ রাজিব খাঁন