ট্রাম্প ও মহিষের ছবি নিয়ে সারা বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে

ট্রাম্প ও মহিষের ছবি নিয়ে সারা বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে
ছবিঃ ই

দৈনিক বিজয় নিউজ বিশেষ প্রতিনিধিঃ

বাংলাদেশের কোরবানির হাটে প্রতি বছরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে কোনো না কোনো বিশাল আকৃতির গরু, বিরল প্রজাতির ষাঁড় কিংবা অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের পশু। তবে এবারের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এক ভিন্নধর্মী চরিত্র—একটি মহিষ। এটি শুধু একটি প্রাণীর গল্প নয়; বরং সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে কীভাবে একটি প্রাণী স্থানীয় কৌতূহল থেকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করতে পারে, তারই এক অনন্য উদাহরণ।

সোনালি চুলের ঝুঁটি আর ব্যতিক্রমী চেহারার কারণে নারায়ণগঞ্জের একটি খামারে জন্ম নেওয়া বিরল এলবিনো মহিষটিকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করেন। আর সেই তুলনা থেকেই তার নাম হয়ে যায় ‘ট্রাম্প মহিষ’। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই খামারের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনামে জায়গা করে নেয় প্রাণীটি।

যেভাবে জন্ম হলো ‘ট্রাম্প মহিষ’-এর

মহিষটির মালিক নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার রাবেয়া এগ্রো ফার্মের খামারি জিয়াউদ্দিন মৃধা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মহিষটির কপালের সামনের সোনালি-হলদেটে চুল দেখে প্রথমে তার ছোট ভাই মজা করে নাম রাখেন ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। কারণ, প্রাণীটির সামনের চুলের বিন্যাস অনেকটাই ট্রাম্পের বহুল আলোচিত হেয়ারস্টাইলের মতো ছিল।

নামটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। দর্শনার্থীরা খামারে ভিড় করতে শুরু করেন। কেউ ছবি তোলেন, কেউ ভিডিও তৈরি করেন, আবার কেউ বানান রিল। অল্প সময়ের মধ্যেই ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিউবে ভাইরাল হয়ে যায় ‘ট্রাম্প মহিষ’।

বিরল এক এলবিনো মহিষ

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি এলবিনো বা বর্ণহীন মহিষ। এলবিনিজমের কারণে প্রাণীর শরীরে মেলানিনের পরিমাণ কম থাকে। ফলে স্বাভাবিক কালো বা ধূসর রঙের পরিবর্তে তাদের গায়ের রঙ হয় সাদা, গোলাপি কিংবা হালকা বর্ণের।

বাংলাদেশে এ ধরনের মহিষ অত্যন্ত বিরল। প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, হাজার হাজার মহিষের মধ্যে এমন বৈশিষ্ট্যের প্রাণী খুব কমই দেখা যায়। সূর্যালোকের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হওয়ায় এদের বিশেষ যত্ন প্রয়োজন। জিয়াউদ্দিন মৃধা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানান, মহিষটিকে প্রতিদিন চারবার গোসল করানো হতো এবং চারবার খাবার দেওয়া হতো। জন্মের পর থেকেই বিশেষ যত্নে তাকে লালন-পালন করা হয়েছে।

হাটের তারকা থেকে আন্তর্জাতিক আলোচনায়

মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে নারায়ণগঞ্জের খামারে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে। কেউ শুধু মহিষটিকে দেখার জন্য ১০০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূর থেকেও ছুটে আসেন। সেলফি তুলতে লাইন পড়ে যায়। কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ভিড়ে খামার এলাকা প্রায় মেলার রূপ নেয়।

পরিস্থিতি আরও বদলে যায় যখন আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এরপর ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমে খবরটি ছড়িয়ে পড়ে। দি গার্ডিয়ান, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, সিবিএস নিউজসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে স্থান পায় ‘ট্রাম্প মহিষ’। বাংলাদেশের কোরবানির হাটের একটি মহিষ তখন বৈশ্বিক পপ-কালচারের আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে।

কোরবানির জন্য বিক্রি, এরপর নাটকীয় মোড়

ঈদুল আজহা উপলক্ষে প্রায় ৭০০ কেজি ওজনের মহিষটিকে বিক্রির পরিকল্পনা করেছিলেন খামার মালিক। শেষ পর্যন্ত সেটি বিক্রিও হয়ে যায়। কিন্তু ঠিক তখনই ঘটে নাটকীয় মোড়।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রাণীটিকে ঘিরে অস্বাভাবিক জনআগ্রহ ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়। ক্রেতার অর্থ ফেরত দিয়ে মহিষটিকে ঢাকার জাতীয় চিড়িয়াখানায় স্থানান্তর করা হয়। ফলে কোরবানির তালিকা থেকে বাদ পড়ে ‘ট্রাম্প মহিষ’।

ডিপ্লোম্যাটিক জল্পনা

মহিষটিকে চিড়িয়াখানায় পাঠানোর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় নতুন আলোচনা। অনেকেই রসিকতা করে বলতে থাকেন, ‘ট্রাম্প’ নামের একটি প্রাণী কোরবানি হলে সেটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে যেতে পারত। কেউ কেউ দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ভুল বোঝাবুঝি এড়াতেই প্রাণীটিকে রক্ষা করা হয়েছে।

তবে এ ধরনের দাবির পক্ষে কোনো সরকারি প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিরল প্রাণীটিকে ঘিরে ব্যাপক জনআগ্রহ এবং নিরাপত্তাজনিত কারণই ছিল মূল বিবেচ্য বিষয়। তারপরও ‘ডিপ্লোম্যাটিক মহিষ’ তত্ত্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় রসিকতায় পরিণত হয়।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও ‘ট্রাম্প মহিষ’

এক সময় বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক আলোচনারও অংশ হয়ে ওঠে। মহিষটির ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরটি এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে দাবি করা হয়, অতিরিক্ত দর্শনার্থীর ভিড়ে প্রাণীটি কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েছে এবং আগের তুলনায় কম খাবার খাচ্ছে।

পরবর্তীতে রাশিয়ায় অবস্থিত ইরানি দূতাবাসের অফিসিয়াল এক্স অ্যাকাউন্ট সেই ভিডিও শেয়ার করে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করে। পোস্টে লেখা হয়, “Poor thing! Bangladeshi buffalo upset by comparisons to Donald Trump.”

বিশ্লেষকদের মতে, এটি নিছক হাস্যরস নয়; বরং চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে একটি সূক্ষ্ম রাজনৈতিক কটাক্ষও ছিল। ফলে বাংলাদেশের একটি ভাইরাল মহিষ মুহূর্তেই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রসিকতার অংশে পরিণত হয়।

ট্রাম্প কি কিছু বলেছেন?

এ পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেছেন—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। হোয়াইট হাউস কিংবা ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এ নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়াও দেখা যায়নি।

তবে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক হাস্যরস তৈরি করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে অসংখ্য মিম। কেউ লিখেছেন, “বাংলাদেশে ট্রাম্পকে শেষ মুহূর্তে বাঁচানো হয়েছে।” আবার কেউ মন্তব্য করেছেন, “আসল ট্রাম্পের চেয়ে মহিষ ট্রাম্পই বেশি জনপ্রিয়।”

কেন এত আগ্রহ?

গণযোগাযোগ বিশ্লেষকদের মতে, ‘ট্রাম্প মহিষ’-এর জনপ্রিয়তার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, এটি ছিল অত্যন্ত বিরল একটি প্রাণী। দ্বিতীয়ত, এর চেহারার সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ব্যতিক্রমী, মজার এবং মানবিক গল্প খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

এই তিনটি উপাদানের সমন্বয়েই ‘ট্রাম্প মহিষ’ স্থানীয় কৌতূহল থেকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।

চিড়িয়াখানার নতুন আকর্ষণ

যে মহিষটির ভাগ্যে কোরবানি লেখা ছিল, সে এখন জাতীয় চিড়িয়াখানার অন্যতম আকর্ষণ। প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী তাকে দেখতে আসছেন। এমনকি বিদেশি কূটনীতিক ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তারাও প্রাণীটিকে দেখতে আগ্রহ দেখিয়েছেন বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশের কোরবানির হাটে প্রতি বছরই নতুন নতুন তারকার আবির্ভাব ঘটে। কিন্তু সোনালি চুলওয়ালা ‘ট্রাম্প মহিষ’-এর মতো বৈশ্বিক খ্যাতি খুব কম প্রাণীর ভাগ্যেই জোটে। হয়তো কয়েক বছর পর এই ঘটনাকে বাংলাদেশের ভাইরাল সংস্কৃতির এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে স্মরণ করা হবে—যেখানে একটি মহিষ প্রমাণ করে দিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে খ্যাতি কখনো কখনো জীবনও বাঁচিয়ে দিতে পারে।