কানাডার নতুন অভিবাসন পরিকল্পনা: অস্থায়ী বাসিন্দা কমানো ও দক্ষ শ্রমশক্তি অগ্রাধিকারের ঘোষণা

কানাডার নতুন অভিবাসন পরিকল্পনা: অস্থায়ী বাসিন্দা কমানো ও দক্ষ শ্রমশক্তি অগ্রাধিকারের ঘোষণা
ছবিঃ মোঃ নাঈম আহমেদ

দৈনিক বিজয় নিউজ বিশেষ প্রতিনিধিঃ

কানাডা তার অভিবাসন ব্যবস্থার গতিপথে একটি উল্লেখযোগ্য মোড় নিয়েছে। ইমিগ্রেশন, রিফিউজি অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডা (আইআরসিসি) ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের জন্য নতুন যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, তাতে স্পষ্ট লক্ষ্য হলো অস্থায়ী বাসিন্দার প্রবেশ সীমিত করে, স্থায়ী অভিবাসনের ক্ষেত্রে দক্ষ ও অর্থনৈতিক শ্রমশক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশটি এখন ‘স্থিতিশীলতার পর্যায়ে’ রয়েছে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি দেশের বাড়ি, স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামোর সক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে।

কেন এই পরিবর্তন?

এই নতুন নীতির পেছনে রয়েছে কানাডার অভ্যন্তরীণ জনসংখ্যা ও শ্রমবাজারের বাস্তবতা। Statistics Canada-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুতে দেশটির জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার COVID-১৯ মহামারির পর সবচেয়ে ধীর গতিতে নেমে এসেছে। একই সাথে, একটি ‘এজিং পপুলেশন’ বা বয়স্ক জনসংখ্যার কারণে, জন্মহার কমে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক খাতে প্রবল দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে দেশের প্রয়োজন বিদেশ থেকে দক্ষ অভিবাসী আনা, তবে তা অবশ্যই একটি পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর ভেতর থেকে।

গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অন্যান্য অস্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য হলো অস্থায়ী অভিবাসনের গতি কমিয়ে ব্যবস্থাটিকে অধিক টেকসই করা এবং ২০২৭ সালের মধ্যে অস্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা।


পরিকল্পনার মূল বিষয়বস্তু: সংখ্যা ও লক্ষ্যসমূহ

নতুন পরিকল্পনাটি দুই স্তরে বিভক্ত: অস্থায়ী বাসিন্দার লক্ষ্যমাত্রা এবং স্থায়ী বাসিন্দার লক্ষ্যমাত্রা।

১. অস্থায়ী বাসিন্দার লক্ষ্য: কমানো হচ্ছে

অস্থায়ী অভিবাসন কমানোই এই নীতি পরিবর্তনের মূল কেন্দ্রবিন্দু। ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত নতুন করে আসা অস্থায়ী বাসিন্দার (নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও বিদেশি কর্মী) সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনা হবে।

বছর সামগ্রিক অস্থায়ী বাসিন্দার লক্ষ্য (নতুন আগমনকারী) আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর লক্ষ্য বিদেশি শ্রমিকের লক্ষ্য (সর্বমোট)
২০২৬ ৩৮৫,০০০ জন ১,৫৫,০০০ জন ২,৩০,০০০ জন
২০২৭ ৩৭০,০০০ জন ১,৫০,০০০ জন ২,২০,০০০ জন
২০২৮ ৩৭০,০০০ জন ১,৫০,০০০ জন ২,২০,০০০ জন

শিক্ষার্থী ভিসায় পরিবর্তন: ২০২৬ সালে মাত্র ১ লাখ ৫৫ হাজার নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীকে স্টাডি পারমিট দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সংখ্যা ২০২৪ সালের লক্ষ্য (৪.৮৫ লাখ) থেকে প্রায় ১৬ শতাংশ কম। তবে, মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ের উচ্চশিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে, পাবলিক ডিজাইনেটেড লার্নিং ইনস্টিটিউশনে (ডিএলআই) মাস্টার্স বা পিএইচডি করতে আসা শিক্ষার্থীদের আবেদনের সময় প্রাদেশিক অ্যাটেস্টেশন লেটার (PAL/TAL) আর লাগবে না।

২. স্থায়ী বাসিন্দার লক্ষ্য: স্থিতিশীল, কিন্তু অগ্রাধিকার বদলেছে

অস্থায়ী বাসিন্দার লক্ষ্য কমানোর বিপরীতে, ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ৩ লাখ ৮০ হাজার স্থায়ী বাসিন্দা গ্রহণের লক্ষ্য অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবে, এই লক্ষ্যের অভ্যন্তরে অগ্রাধিকার বণ্টনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।

অর্থনৈতিক শ্রমশক্তিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব: নতুন পরিকল্পনায় স্থায়ী অভিবাসনের প্রায় ৬৪ শতাংশই অর্থনৈতিক ক্যাটাগরির (Economic Class) অধীনে আসবে। এর অর্থ হলো, কানাডার শ্রমবাজারের চাহিদা মেটাতে পারে এমন দক্ষ অভিজ্ঞ পেশাজীবী, বণিক ও ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। প্রাদেশিক মনোনয়ন প্রোগ্রাম (PNP) এবং ফেডারেল হাই স্কিলড (Express Entry-র অন্তর্ভুক্ত) প্রোগ্রামের মাধ্যমে এই দক্ষ শ্রমিকদের আহ্বান করা হবে।

  • প্রাদেশিক মনোনয়ন প্রোগ্রাম (PNP): অনেক প্রদেশে তাদের PNP কোটায় পরিবর্তন এসেছে। Alberta, New Brunswick এবং Manitoba-এর মতো প্রদেশগুলো ২০২৫ সালে অতিরিক্ত কোটাও পেয়েছে। তবে, অনেক প্রদেশ এখন তাদের প্রোগ্রামের শর্ত কড়া করেছে। উদাহরণস্বরূপ, British Columbia নতুন গ্র্যাজুয়েট স্ট্রিম সাময়িক বন্ধ রেখেছে এবং Nova Scotia স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ খাতের মতো নির্দিষ্ট পেশার প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

  • ফ্রেঞ্চ-ভাষী সম্প্রদায়: পরিকল্পনাটি কুইবেকের বাইরে ফরাসি-ভাষী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিকাশের লক্ষ্যকেও জোরদার করেছে। ২০২৮ সালের মধ্যে কুইবেকের বাইরে যাওয়া ফ্রেঞ্চ-ভাষী স্থায়ী বাসিন্দার লক্ষ্য ১০.৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে।

বিশেষ উদ্যোগ: লক্ষ্যমাত্রার বাইরেও বিশেষ দুইটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে:

  • ২০২৬-২০২৭ সালে ৩৩,০০০ অস্থায়ী বিদেশি কর্মীকে স্থায়ী বাসিন্দায় রূপান্তর: যেসব কর্মী ইতিমধ্যে কানাডায় কাজ করছেন, সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছেন এবং কর প্রদান করছেন, তাদের স্থায়ীভাবে রাখতে এই পদক্ষেপ।

  • দুই বছরে ১,১৫,০০০ সংরক্ষিত ব্যক্তির (Protected Persons) আবেদন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা: কানাডায় আশ্রয় পাওয়া শরণার্থীদের স্থায়ী মর্যাদা দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত করা হবে।

অন্যান্য বিভাগ: পারিবারিক পুনর্মিলন (Family Class) এবং শরণার্থী (Refugee) ক্যাটাগরির লক্ষ্যগুলো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখা হয়েছে, যা প্রতিবছর যথাক্রমে প্রায় ৮৪,০০০ এবং ৫৬,২০০ স্থায়ী বাসিন্দা গ্রহণের সমতুল্য।


আগামীর ইঙ্গিত: অভিবাসনের ভবিষ্যৎ কি কঠিন হচ্ছে?

কানাডার নতুন পরিকল্পনা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, পরিমাণের উপর নয়, গুণগত মান ও কৌশলগত প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো একটি দীর্ঘমেয়াদি, ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এর অর্থ দাঁড়ায়:

  • শিক্ষার্থীদের জন্য: উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় (মাস্টার্স/পিএইচডি) আসা শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ অপেক্ষাকৃত উন্মুক্ত থাকলেও, অন্যান্য স্তরে পড়তে আসার পথ সীমিত হতে পারে।

  • দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য: অর্থনৈতিক ক্যাটাগরি, বিশেষ করে Express Entry এবং PNP-এর মাধ্যমে দক্ষ কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের সুযোগ আগের মতোই থাকছে, এমনকি বাড়ছে। যারা ইতিমধ্যে কানাডায় কাজ করছেন এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন, তাদের জন্য সুযোগ আরও স্পষ্ট।

  • শ্রমবাজারের জন্য: স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, দক্ষ কারিগরি পেশা (Skilled Trades), কৃষি ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো কানাডার উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন পেশা ও খাতগুলোর দিকে অভিবাসন প্রবাহ আরও বেশি মনোযোগী হবে।

সামগ্রিকভাবে, কানাডা তার দরজা বন্ধ করছে না, বরং কে, কীভাবে এবং কোন পথে প্রবেশ করবে তা আরও সুনির্দিষ্ট ও পরিকল্পিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে।

দৈনিক বিজয় নিউজ/ মোঃ নাঈম আহমেদ