ভোলা-বরিশাল সেতু: যোগাযোগে বিপ্লবের সূচনা

ভোলা-বরিশাল সেতু: যোগাযোগে বিপ্লবের সূচনা
ছবিঃ সংগৃহীত

দৈনিক বিজয় নিউজ বিশেষ প্রতিনিধিঃ

                           ভোলার গ্যাস সম্পদ একটি জাতীয় সুযোগের অপেক্ষায়

ভোলায় ইতিমধ্যে ইলিশাসহ মোট নয়টি প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে, যেখানে মজুতের সম্ভাব্য পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)।

বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা, ভোলা দ্বীপটি যেন প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপরই ভাসছে। সঠিক গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করলে এখানে আরও আট টিসিএফেরও বেশি গ্যাস মজুত পাওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশে বর্তমানে বার্ষিক গ্যাস ব্যবহার হয় প্রায় এক টিসিএফ। সে হিসাবে শুধু ভোলার প্রাথমিকভাবে শনাক্তকৃত গ্যাস দিয়েই দেশের চাহিদা প্রায় দশ বছর ধরে মেটানো সম্ভব।

এই আবিষ্কারের অর্থনৈতিক তাৎপর্য বোঝা যাবে একটি উদাহরণে: বর্তমানে দেশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) চাহিদা মেটাতে আমাদের বছরে প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় পর্যাপ্ত পরিমাণে এলএনজি আমদানিও করা সম্ভব হচ্ছে না, যার ফলে গ্যাসের অভাবে দেশের অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রই বন্ধ রয়েছে। অথচ, পাইপলাইন সুবিধা না থাকায় ভোলার এই বিপুল গ্যাস সম্পদ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যাচ্ছে না।

দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি নীতিনির্ধারকদের একটি বদ্ধমূল যুক্তি ছিল যে, পাইপলাইনের মাধ্যমে ভোলার গ্যাস আনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং এটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত কোনো বিশ্বাসযোগ্য সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই নেওয়া হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

ওয়াকিবহাল মহলের অভিমত, গত এক দশকে দেশের স্থলভাগ ও বিশাল সমুদ্রাঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কাজ ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। ২০১২ ও ২০১৪ সালে মিয়ানমার ও ভারতের বিরুদ্ধে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত মামলা জিতে বাংলাদেশ ১ লাখ ৭৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন অর্জন করলেও গত ১২ বছরে এই এলাকায় অনুসন্ধান কাজ কার্যত শুরুই করা হয়নি।

এমন প্রেক্ষাপটে, ভোলায় যদি সত্যিই ৮ থেকে ১০ টিসিএফ গ্যাসের মজুত নিশ্চিত হয়, তাহলে ভোলা-বরিশাল সেতু ও পাইপলাইন প্রকল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ‘গেম চেঞ্জার’ হয়ে উঠতে পারে। এত বছর ধরে ভোলার গ্যাস গ্রিডে যুক্ত না করতে পারার পেছনে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর ব্যবসায়িক স্বার্থ কাজ করছে কিনা, সে বিষয়েও সংশয় থেকে যায়।

মূল সমস্যা হলো, ভোলায় প্রাপ্ত গ্যাসকে কীভাবে অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী উপায়ে মূল ভূখণ্ডে নিয়ে আসা যায়। ২০২৩ সালের মে মাসের একটি সংবাদ অনুযায়ী, ভোলার শাহবাজপুর ও ভোলা নর্থ গ্যাসক্ষেত্র থেকে বরিশালের লাহারহাট পর্যন্ত ৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইন স্থাপনের জন্য ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে বিবেচনাধীন ছিল। পরবর্তীতে এই পাইপলাইন কুয়াকাটা-বরিশাল-গোপালগঞ্জ-খুলনা হয়ে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত হবার কথা।

এই প্রকল্পের ব্যয় ১,৫০০ থেকে ২,০০০ কোটি টাকায়ও পৌঁছায়, তবুও তা অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত লাভজনক। কারণ, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ১৪-১৬ ডলার হিসাবে ভোলার ১.৭৫ টিসিএফ গ্যাসের মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। মাত্র দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে পারলে তা জাতীয় অর্থনীতির জন্য কী বিশাল অবদান রাখবে, তা সহজেই অনুমেয়।

প্রস্তাবিত এই পাইপলাইন ভবিষ্যতে আরও কৌশলগত সুবিধা বয়ে আনবে। বর্তমানে এলএনজি টার্মিনালগুলো কক্সবাজার-মহেশখালী অঞ্চলে অবস্থিত। ভবিষ্যতে মিয়ানমারের সঙ্গে কোনো প্রকার বৈরিতা দেখা দিলে ভোলায় একটি বিকল্প এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করে এই পাইপলাইনের মাধ্যমেই জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

তাছাড়া, বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে গভীর সমুদ্রের ব্লকগুলোতে গ্যাসের সন্ধান পায়, সেক্ষেত্রেও এই পাইপলাইনটি এলএনজি পরিবহনের সবচেয়ে সাশ্রয়ী মাধ্যম হয়ে উঠবে। এমন সম্ভাবনা মাথায় রেখে পাইপলাইনের ব্যাস ৩০ ইঞ্চির চেয়েও বেশি করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

সরকারের এখনই উচিত ভোলা-বরিশাল গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পটি দ্রুত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করে অনুমোদন নেওয়া। পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ভোলা-বরিশাল সড়ক সেতুর সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও চলমান। এই সেতুটি নির্মিত হলে এর ওপর দিয়েই গ্যাস পাইপলাইন স্থাপন করা যুক্তিযুক্ত হবে। তাই, চাঁদপুর-শরীয়তপুর সেতুর চেয়ে ভোলা-বরিশাল সেতুকে অগ্রাধিকার দেওয়া অনেক বেশি যৌক্তিক।

সন্দেহাতীতভাবে, ভোলায় বৃহৎ পরিমাণ গ্যাসের মজুত নিশ্চিত হলে ভোলা-বরিশাল সেতু ও পাইপলাইন প্রকল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভাগ্য পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী নিয়ামক হয়ে উঠবে।

দৈনিক বিজয় নিউজ/ মোঃ নাঈম আহমেদ