বার্ন ইনস্টিটিউটে কান্নাভেজা স্তব্ধ এক সন্ধ্যা

বার্ন ইনস্টিটিউটে কান্নাভেজা স্তব্ধ এক সন্ধ্যা
ছবিঃ মোঃ নাঈম আহমেদ

দৈনিক বিজয় নিউজ বিশেষ প্রতিনিধিঃ

কেউ পানি, স্যালাইন, শুকনো খাবার বিতরণ করছেন। হাসপাতালের প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে থাকা সেনাবাহিনীর সদস্যরা জনসাধারণের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করছেন।

জরুরি বিভাগে ঢুকতেই চোখে পড়ে উদ্বিগ্ন মুখের সারি। কারও চোখে জল, কারও দৃষ্টি শূন্য, স্তব্ধ। সোমবার সন্ধ্যায় জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের সামনের দৃশ্য ছিল কান্না, চিৎকার আর রক্তের আকুতি; বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল শোক আর আতঙ্কে। ভেতরে অনেকে নিথর দাঁড়িয়ে, কেউবা মুঠোফোনে একের পর এক ফোন করে প্রিয়জনের খবর নিচ্ছেন। সবার কথায় কথায় মাইলস্টোন স্কুলের ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার বর্ণনা।

হেল্প ডেস্কের সামনে কাঁদছিলেন মাঝবয়সী এক নারী। তাঁর ছেলে বোরহান উদ্দিন, মাইলস্টোনের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। ছেলের ছবি দেখে জানতে পারলেন, সে বার্ন ইনস্টিটিউটেই আছে। "আমার ছেলে খুব ভীতু," কাঁদতে কাঁদতে বললেন তিনি, "সকাল আটটায় বেরিয়েছে। আমি একটু দেখতে চাই।"

হঠাৎই একটি কক্ষ থেকে ছুটে বেরিয়ে মধ্যবয়সী এক পুরুষ কেঁদে উঠলেন, মেঝেতে বসে পড়লেন। ধরে রাখলেন আরেকজন। তিনি জানালেন, কাঁদছেন রুবেল—তাঁর ভায়রা। এইমাত্র পেয়েছেন ছেলে তানভীর আহমেদের মৃত্যুসংবাদ। রুবেলের দুই ছেলেই মাইলস্টোন স্কুলে পড়ত। বড় তানভীর অষ্টম শ্রেণিতে, ছোট চতুর্থ শ্রেণিতে। দুর্ঘটনায় ছোট ছেলে বেঁচে গেলেও বড় ছেলে আর ফেরেনি।

ইনস্টিটিউটের তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় চলছে আহতদের চিকিৎসা, চতুর্থ তলায় আইসিইউ। লিফটে উঠতেই এক কোণে ডুকরে কাঁদছিলেন আরেক নারী। চতুর্থ তলায় নামতেই চোখে পড়ল মেঝেজুড়ে বিমূঢ় চেহারা। কারও চোখ ছলছল, কেউ উচ্চৈঃস্বরে কাঁদছেন। এক কক্ষে আহাজারি করছিলেন কয়েকজন নারী। আইসিইউর সামনে স্বজনদের ভিড়; কেউ কেউ দরজার ফাঁক দিয়ে এক ঝলক প্রিয়জনকে দেখার আকুতি জানাচ্ছেন।

প্রবেশমুখের সাদা বোর্ডে কালো কালিতে লেখা মাইলস্টোনে বিমান দুর্ঘটনায় আহতদের নাম ও আইসিইউ বেড নম্বর:

১২. শায়ান ইউসুফ—৯৫%
০৮. মাহতাব—৮৫%
১৪. মাহিয়া তাসনিম—৫০%
...এমন নয়টি নাম। প্রত্যেকেরই শ্বাসনালি মারাত্মকভাবে পুড়ে গেছে।

বোর্ডের পাশেই সজল চোখে ফোনে কথা বলছিলেন এক মধ্যবয়সী পুরুষ। "আমার অবস্থা ভালো না," বললেন, "আমার ছেলেটা আইসিইউতে।" ফোন নামিয়েই হু হু করে কেঁদে ফেললেন তিনি। তিনি মোহাম্মদ ইউসুফ, শায়ান ইউসুফের বাবা এবং মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজেরই শিক্ষক। তাঁর ছেলে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র।

বাইরে বেরোতেই চোখে পড়ে স্বেচ্ছাসেবক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মব্যস্ততা। রক্তদাতাদের ভিড়ও কম নয়। মাইকে বারবার ঘোষণা করা হচ্ছে, 'এই মুহূর্তে রক্তের প্রয়োজন নেই।' তবু অনেকে অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে—হয়তো আবার ডাক পড়বে এই আশায়। আসাদুল ইসলাম বললেন, "আমার রক্তের গ্রুপ ও পজিটিভ। এখন না লাগুক, পরে তো লাগতেই পারে। বাচ্চাগুলো তো শেষ হয়ে গেল, ভাই।"

জরুরি বিভাগের ফটকে আবারও সাইরেন বাজিয়ে ঢুকল একটি অ্যাম্বুলেন্স। স্বেচ্ছাসেবকেরা দৌড়ে গেলেন রাস্তার বাড়তি ভিড় সরাতে।

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। বার্ন ইনস্টিটিউটের ভেতরে যেন সময় স্থবির। পরিবারগুলো ছুটছে এক ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডে—প্রিয়জনের খোঁজে। ডাক্তার-নার্সদের চোখেমুখে ক্লান্তি, তবু কাজ থেমে নেই।

শুধু হাসপাতাল নয়—এই রাত গোটা শহরেরই এক মর্মান্তিক দুঃস্বপ্ন। সন্তান হারানো পরিবারগুলোই শুধু নয়, যারা বেঁচে আছেন, তাদের মনেও রয়ে যাবে গভীর ক্ষতের দাগ।

দৈনিক বিজয় নিউজ/ মোঃ নাঈম আহমেদ