পাবনায় অসময়ে ফোঁটা ফুল হাফসা আর নেই পৃথিবীতে

পাবনায় অসময়ে ফোঁটা ফুল হাফসা আর নেই পৃথিবীতে
ছবিঃ এস এম এম আকাশ

 দৈনিক বিজয় নিউজ পাবনা প্রতিনিধিঃ

পাবনা পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড, উত্তর শালগাড়িয়া সরদারপাড়া।একটি সাধারণ গ্রাম, যেখানে মানুষ ছোট ছোট আনন্দে জীবনের কথা ভাবত। কিন্তু সেই শান্তি আজ ভাবতেই ঝড়ের মতো তছনছ। শনিবার (১৫ নভেম্বর ২০২৫)সন্ধ্যা ৬টা এক ফুটফুটে শিশু, মাত্র ৯ বছর বয়সী হাফসা, নিখোঁজ হয়। সে মল্লিক সরদারের নাতনি, প্রবাসী হাফিজুর রহমানের মেয়ে, দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। নিখোঁজ হওয়া মাত্রই পরিবার আতঙ্কিত, পুরো এলাকা উৎকণ্ঠিত।অনেক মাইকিং করা হলো, আশেপাশে অনেক খোঁজাখুঁজি করা হলো। কিন্তু কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। দুঃখ জনক, হৃদয় বিদারক, প্রায় দুই ঘণ্টা পর রাত ৮টার দিকে বাড়ির পেছনের জঙ্গলের ভেতর, কটন মিলের পেছনে, পাটিতে মোড়ানো কাঁদা মাখা মরদেহ। যেখানে সাধারণ মানুষের যাতায়াত খুবই কম, সেখানে আগে থেকেই নেশাখোর বখাটেরা ঘুরত আড্ডা দিতো। এই নির্জনতা, ভীতি সবই বঞ্চিত করেছিল শিশুটিকে নিরাপদ আশ্রয় থেকে।

অসহ্য ক্ষণ, এক মূহুর্তে হৃদয় টুকরো টুকরো হয়ে যায়। একটি ফুটফুটে প্রাণ, যে এখনও স্কুলের ক্লাসে খেলা করত, মা-বাবার ভালোবাসায় ঘেরা, গ্রামের স্বপ্নে ভরা তার জীবন চিরতরে নিঃশেষ করে দিলো। কত ছোট ছিল সে, কত নিরীহ, কত অসহায়, কত মিশুক। তার কোনো অপরাধ ছিল না। শুধুই ছিল সে এক অবুঝ মানব একটি শিশু, যার ভবিষ্যৎ, হাসি, স্বপ্ন এখন আর নেই। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন রমজান (২৮) ও সাব্বির (২৫)কে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো শাস্তি হয়নি। হবে কিনা তাও নিশ্চিত করা বলা ঠিক হবেনা। বিগত এক দেড় বছরে যা ঘটছে মবতন্ত্রে তাতে আন্দাজ করা ছাড়া আর কি করার আছে।

সরেজমিনে তদন্তে রয়েছেন সার্কেল এএসপি শরিফুল ইসলাম, সদর থানার ওসি আব্দুস সালাম, তদন্ত ওসি সঞ্জয় কুমার, সাতটি গাড়িবাহিনী ফোর্স এবং পিবিআই-এর কর্মকর্তারা। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেন কিন্তু এই তদন্তের খাতিরে কি আর হাফসার ক্ষতচিহ্ন ভরা নিঃশ্বাস ফিরিয়ে আনা যাবে? এলাকার মানুষ ক্ষুব্ধ, শোকাহত, তারা চিৎকার করছে এতো নিষ্পাপ শিশুর সঙ্গে এমন বর্বরতা কেন..? প্রতিবেশীরা জানাচ্ছেন, জায়গাটি আগে থেকেই বখাটে ও মাদক সেবীদের আড্ডাস্থল ছিল। ভয়ে কেউ কিছু বলত না। অথচ সেই অবহেলা আর নির্বিকার পরিস্থিতি আজ এমন নৃশংসতার জন্ম দিয়েছে। শালগাড়িয়া, সরদারপাড়া তথা পুরো পাবনা এই একটি ছোট্ট শিশুর হত্যাকাণ্ড আমাদের সবাইকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করছে আমাদের সমাজ, আমাদের নিরাপত্তা, আমাদের প্রশাসন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? আমরা কি আরও কতগুলো নিরীহ প্রাণ হারাতে চাই?
বিবেক আমায় জবাব দাও ?

হাফসা আর নেই। কিন্তু তার জন্য আমাদের ক্ষোভ, আমাদের প্রতিরোধ, আমাদের দাবী সবই জেগে উঠছে। আমরা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি একই সাথে দাবী করছি দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। শিশুদের নিরাপত্তার জন্য কঠোর আইনি ব্যবস্থা। এ ধরনের নিরীহ প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি রোধে সামাজিক সচেতনতা। আজ আমরা শুধু একটি পরিবারের শোক বোধ করছি না, আমরা একটি সমাজের দুঃখ-পাজর ভেঙে যাওয়াকে অনুভব করছি,বিগত শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর থেকে অনুভব করছি দেশ জুড়ে ধর্ষনের প্রতিযোগীতা। আমাদের বিবেক কবে আমাদের শিশুদেরকে রক্ষা করবে, নিস্তার দিবে? আমাদের শিশুরা নিরাপদ না হলে কেউ নিরাপদ নয়। হাফসার প্রাণের জন্য আমরা চিৎকার করতেই হবে, প্রতিবাদ শুধু ফেসবুকে নয় প্লাকাডে, পত্রিকার পাতায় নয়! রাজপথে আমাদের আওয়াজ তুলতে হবে সংসদে, আদালতে মানুষের বিবেকের আদালতে !

মাদক বিরুদ্ধে অবহেলা-অন্যায়কে প্রতিহত করার জন্য রুখে দাঁড়াতে হবে স্বদলবলে মতৈক্যে! হাফসা ফুটে ওঠা সেই ছোট্ট ফুল, যার হাসি আর শ্বাস আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার স্মৃতিই আমাদেরকে জাগ্রত রাখবে, সজাগ রাখবে, এবং কখনো ভোলা যাবে না। এই ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের নয় আমাদের সবার নিরাপত্তার প্রশ্ন। ৯ বছরের হাফসার প্রতি এই নির্মমতা-নিষ্ঠুরতা বর্বরতা বরদাশত করা যায় না। দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে প্রতিটি মানুষের মুখে মুখে ঝড় বইছে। দেখা যাক দোষীদের আইনের আওতায় এনে কতটা শাস্তি নিশ্চিত করতে পারে আমাদের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী?

দৈনিক বিজয় নিউজ/ এস এম এম আকাশ